
বিশেষ প্রতিবেদন
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে সবচেয়ে আতঙ্কজনক এবং অস্বাভাবিক যে অধ্যায়টি তৈরি হয়েছে, তা হলো গত সতের মাসে ঘটে যাওয়া ব্যাপক নিখোঁজের ঘটনা। বিভিন্ন সূত্রের অভিযোগ অনুযায়ী, এই স্বল্প সময়ে অন্তত ছয় হাজার মানুষ হঠাৎ করেই উধাও হয়ে গেছে। সংখ্যাটি বড় হওয়ার পাশাপাশি আরও উদ্বেগজনক হলো এই মানুষেরা সবাই পরিচিত, প্রকাশ্য রাজনৈতিক কর্মী। তারা আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ, যুবলীগ, শ্রমিক লীগ, মহিলা লীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ ও বঙ্গবন্ধু পরিষদের সক্রিয় সদস্য ছিলেন। তারা কোনো গোপন বা আন্ডারগ্রাউন্ড রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন না।
কিছু নিখোঁজের লাশ উদ্ধার হলেও অধিকাংশের কোনো খোঁজ নেই। নেই কোনো গ্রেপ্তার দেখানো, নেই কোনো চার্জশিট বা বিচারিক প্রক্রিয়া। এসব ঘটনাকে কেন্দ্র করে যে প্রশ্নটি সবচেয়ে বড় হয়ে উঠেছে তা হল রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর অস্বাভাবিক নীরবতা। যেখানে সতের মাসে হাজার হাজার মানুষ গুম হয়ে যায়, সেখানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর “আমরা কিছু জানি না” অবস্থান রাষ্ট্রের জবাবদিহিকে গভীরভাবে সন্দেহের মুখে ঠেলে দিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, রাষ্ট্র যখন নীরব থাকে, তখন অদৃশ্য শক্তিগুলোই আরও বেশি দৃশ্যমান হয়ে ওঠে।
এই রাজনৈতিক শূন্যতার সুযোগ কে নিচ্ছে, সেটিও এখন এক বড় প্রশ্ন। অভিযোগ রয়েছে, ইসলামী জঙ্গি গোষ্ঠী এবং বিএনপি–জামায়াত–এনসিপি ঘরানার শক্তিগুলো এই অস্থিরতার মধ্যেই লাভবান হয়েছে। বিরোধী রাজনৈতিক কাঠামো দুর্বল হলে কারা শক্তিশালী হয় তা নিয়ে আর কোনো রহস্য নেই। দেশের রাজনৈতিক ভারসাম্য ভয়াবহভাবে বদলে গেছে, এবং এই পরিবর্তন স্বাভাবিক প্রবাহের অংশ নয় বরং ইচ্ছাকৃতভাবে তৈরি করা হয়েছে কি না তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
নিখোঁজদের পরিবারগুলো প্রতিদিন আদালত, থানাপুলিশ, মানবাধিকার সংস্থা—সব জায়গায় ঘুরে বেড়াচ্ছে। কিন্তু রাষ্ট্র নীরব। এই নীরবতাই সবচেয়ে ভয়ংকর, কারণ নীরবতা মানে দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়া। উন্নয়ন, শৃঙ্খলা, স্থিতিশীলতা—এসব শব্দ শোনা যায়, কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে মানুষ হারিয়ে যাচ্ছে এবং তাদের খোঁজ কেউ নিচ্ছে না।
যে শাসনামলে স্বাধীনতার পর সবচেয়ে বড় গুমের অভিযোগ ওঠে, সেই শাসনকে ন্যায়বিচারমূলক বলা কতটা সম্ভব—এ প্রশ্ন এখন দেশের মানুষের মনে তীব্রভাবে ফিরে ফিরে আসছে। ইতিহাস নীরব থাকে না। একদিন ইতিহাসই সব প্রশ্নের উত্তর চাইবে। আর গুমের তালিকা কোনোদিন চাপা পড়ে থাকে না।